একটি অমীমাংসিত রক্তলিপি
—রফিক আতা—
আমি যেন কোথাও পড়েছি— পুরুষ মানুষের চোখে জল বেমানান; কান্না করাটাও নাকি কঠিন। নিজের উপরেই এই তত্ত্বের এক্সপেরিমেন্ট চালালাম— দেখলাম, সত্যিই সহজে কাঁদা যায় না।
কিন্তু এই ‘বেমানান’ শব্দটাই হয়তো পুরুষত্বের সবচেয়ে বড় মিথ্যা।
আজ ঠিক আমার কী হলো, জানি না। কি-বোর্ডে অনবরত আঙুল চালাচ্ছি, অথচ লেখাগুলো খুবই ঝাপসা দেখছি; চোখ ছুঁয়ে বুঝতে পারি— আমি কাঁদছি।
এই কান্না কি দুর্বলতার! নাকি প্রেম হারানোর বেদনার! — না! এই কান্না দুর্বলতার নয়! এ এক অক্ষম প্রতিবাদের জল। এ এক অশান্ত হৃদয়ের প্রতিবাদী অনলের বাষ্প। যে অনল বহুদিন চেপে রাখা ছিল সভ্যতার মুখোশের নিচে।
তবে কি আমি খুব বেশিই দুখ পেলাম? কি সেই দুখের কারণ— যা আমার পাথুরে হৃদয়কেও ঝর্ঝরিত করে দিল? নাকি দীর্ঘদিন চেপে রাখা ন্যায়বোধ আজ হঠাৎ ফেটে পড়েছে?
এই মুহূর্তে কেবল শরীফ ওসমান হাদি ভাইয়ের কিছু কথা যেন শোকের অনলে হৃদয় পুড়িয়ে ছাঁই করে দিচ্ছে—
এই কথাগুলো শুধু স্মৃতি নয়; এ যেন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও জীবনের পক্ষে দেওয়া এক দৃপ্ত সাক্ষ্য।
"একটা তুমুল মিছিল হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সেই মিছিলের সামনে আমি আছি। কোন একটা বুলেট এসে আমার বুকটা হয়তো বিদ্ধ করে দিয়েছে। এবং সেই মিছিলে আমি হাসতে হাসতে আমি শহীদ হয়ে গেছি। এবং সবাই যখন মৃত্যুটাকে ভীষণ ভয় পায়। আমি তখন হাসতে হাসতে আল্লার কাছে ভীষণ সন্তুষ্টি নিয়ে পৌছাতে চাই। যে আমি একটা নূন্যতম এই জীবনটা লিট করতে পারলাম। যে আমি একটা ইনসাফের হাসি নিয়ে আমি আমার আল্লাহর কাছে পৌছাতে চাই।"
বত্রিশ সেকেন্ডের ছোট একটি ভিডিও ক্লিপ এই মুহূর্তে আমার সামনে, যেখানে এই কথাগুলো হৃদয় নিংড়িয়ে অনর্গল বলে যাচ্ছিলেন হাদি ভাই । অথচ সেই বত্রিশ সেকেন্ড আমার ভেতরের বহু বছরের নীরবতাকে চূর্ণ করে দিল। খোলা বাতায়নে হিমেল বাতাস বইছে। শীতল বাতাসের স্পর্শ আমার সমগ্র সত্তাকেও হিম করে দিচ্ছে। কান্নার মৃদু জল বাঁ হাত দিয়ে মুছতে মুছতে ভাবি—
— কিছু মানুষ মরে না; তারা নৈতিকতার উচ্চতায় উঠে যায়। হাদি ভাইয়ের শাহাদাত তাই কেবল একটি মৃত্যুসংবাদ নয়— এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে জীবিত থাকার চূড়ান্ত ঘোষণা।
আজ আমার কান্না ব্যক্তিগত নয়।
এ কান্না এক ব্যর্থ সময়ের বিরুদ্ধে, এক নিষ্ঠুর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, আর সেই সাহসের স্মরণে— যা আমাদের আর নেই।
হাদি ভাইয়ের শাহাদাত আমাকে শিখিয়ে দিল—
জীবন বড় না, ইনসাফ বড়।
শ্বাস দীর্ঘ না, অবস্থান দৃঢ় হওয়াই আসল।
রক্তলিপি
উনিশ, বারো, পঁচিশ ইং
শুক্রবার।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।